ডাঃ বিমল ছাজেড়

চিকিৎসাবিজ্ঞান জগতে এক যুগান্তকারী নাম ডাঃ বিমল ছাজেড়, এমডি। এই উপমহাদেশে নন-ইনভেসিভ কার্ডিওলজির প্রবর্তক। প্রতিকারমূলক কার্ডিওলজির একজন চমৎকার শিক্ষকও তিনি। অপারেশন বা কাটা-ছেঁড়া হৃদরোগ চিকিৎসা পদ্ধতির বিপরীতে জীবন পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘাতক হৃদরোগ থেকে মুক্তির রক্তপাতহীন সহজ পথের দিশারী তিনি।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের জৈন ধর্ম পরিবারে ১৯৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা সেন্ট লরেন্স হাইস্কুলে পড়াশোনা শেষে ১৯৮৬ সালে কলকাতার আর.জি.কার মাইকেল মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন।

২৫ বছর বয়সে নয়াদিল্লির ডাঃ রাম মনোহর লেহিয়া হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে (Cardiology Department) কাজ শুরু করেন।সেখানে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা তার জীবনটা পরিবর্তন করে দেয় এবং হৃদরোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে তার ধ্যানধারণা নতুন মোড় নেয়।

তিনি পরবর্তীকালে লাখনৌ কিং জর্জ মেডিকেল কলেজ (King George’s Medical College, Lucknow) থেকে হৃদরোগের চিকিৎসার ওপর এমডি ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন এবং সেখানে অপারেশন ছাড়া হৃদরোগীদের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণাও করেন। এমডি করার পর বিখ্যাত নিখিল ভারত চিকিৎসাবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (All India Institute of Medical Sciences-AIIMS)-এ সিনিয়র রেসিডেন্ট ও সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছর কাজ করেন। তিনি যোগব্যায়াম চিকিৎসা পদ্ধতির (Yoga Theraphy) ওপরও প্রশিক্ষণ নেন। AIIMS-এ তার গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, হৃদরোগীরা করোনারি হার্ট ডিজিজকে শুধু প্রতিরোধই করে না বরং হৃদরোগ সারিয়ে তোলে অথবা তা থেকে নীরোগ অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। আমেরিকার Non-Invasive Cardiology-এর অগ্রদূত ডাঃ ডিন অরনিশের নিকট প্রশিক্ষণকালেও ডাঃ ছাজেড় প্রমাণ করেন যে, জীবনযাপন পদ্ধতির মাধ্যমে হৃদরোগ থেকে আগের নীরোগ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

১৯৯৫ সালে ডাঃ বিমল ছাজেড় AIIMS থেকে পদত্যাগ করে সাওল (Science And Art Of Living-SAAOL) বা জীবনযাপন পরিবর্তনের মাধ্যমে হৃদরোগের চিকিৎসা নামে এক নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করে হৃদরোগীদের চিকিৎসা এবং ট্রেনিং প্রদান শুরু করেন। দক্ষিণ দিল্লীর লাজপাত নগরের বিক্রম বিহারে স্থাপন করেন এর কার্যালয়, যা পরবর্তীতে পরিণত হয় প্রধান কার্যালয়ে। ১৯৯৭ সালে ডাঃ ছাজেড় মুম্বাইয়ে তার দ্বিতীয় ক্লিনিক উদ্বোধন করেন এবং পরবর্তী সময়ে মুম্বাই, কোলকাতা, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর, হায়দরাবাদ, রাজকোট, জয়পুর, জোধপুর, পুনাসহ ভারতে এপর্যন্ত ৬৩টি শাখা স্থাপন করেন। এছাড়া বাংলাদেশে ঢাকায় ১টি , নেপালের কাঠমুন্ডুতে ১টি এবং আমেরিকার লসএঞ্জেলেসে ১টি সাওল-এর শাখা রয়েছে। দিন দিন এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ডাঃ বিমল ছাজেড় SAAOL HEART CENTER-এর প্রধান কার্যালয় Vikkar Bihar থেকে Farm No. 5, DLF Westend Mandi Road, Chhattarpur, New Delhi-110030 ঠিকানায় স্থানান্তর করেছেন। বর্তমানে তার উদ্ভাবিত সাওল হার্ট প্রোগ্রাম বিনা অপারেশনে হৃদরোগ থেকে নীরোগ করার পদ্ধতি হিসেবে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে। এই পদ্ধতিতে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার সঙ্গে রোগীদের ইয়োগা, মেডিটেশন, তেল ছাড়া রান্না, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, ব্যায়াম এবং চিকিৎসাশাস্ত্রীয় জ্ঞানার্জন- এইসব সম্মিলিত পদ্ধতিতে হৃদরোগীকে স্থায়ীভাবে সুস্থ করে তোলা হয়। ডাঃ ছাজেড় হার্টের রোগীদের ওপর বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দীসহ শতাধিক বই লিখেছেন, ভিসিডির আকারে তার অসংখ্য লেকচার পাওয়া যায়। তিনি প্রতিকারমূলক কার্ডিওলজির একজন চমৎকার শিক্ষক। তিনি সমগ্র ভারত ও পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন নন-ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতি বিস্তৃত করার লক্ষ্যে। তিনি হৃদরোগ চিকিৎসা বিষয়ক একটি দ্বিমাসিক পত্রিকা পরিচালনা করছেন।

ডাঃ বিমল ছাজেড় এক লক্ষেরও অধিক রোগীর চিকিৎসা করেছেন এবং হার্ট অ্যাটাক, বাইপাস সার্জারি ও এঞ্জিওপ্লাস্টি থেকে মুক্ত থাকার জন্য রোগীদের সাহায্য করেছেন। তিনি ভারতের প্রাক্তন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শ্রী শংকর দয়ালজি শর্মাকে চিকিৎসা করেছেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান সম্মানিতা শ্রী প্রতিভা ডি. পাতিল এবং তার স্বামী ডাঃ ছাজেড়ের কাছ থেকে তিন দিনের একটি হার্ট কেয়ার ট্রেনিং গ্রহণ করেছেন।

ডাঃ ছাজেড় রাজীব গান্ধী রাষ্ট্রীয় একতা পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। বর্তমানে তার ক্যাম্প ও লেকচার ভারতের স্বনামধন্য ইমামী ফাউন্ডেশনসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতা করছে।

প্রতিকারমূলক কার্ডিওলজিকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে এবং ইনভেসিভ কার্ডিওলজির ব্যাপক ব্যবহারের বিরুদ্ধে ডাঃ ছাজেড় দু’টি নন-ইনভেসিভ চিকিৎসা চালু করেছেন। এগুলো হলো ন্যাচারাল বাইপাস এবং বায়োকেমিক্যাল এঞ্জিওপ্লাস্টি। উভয়ই খুব কার্যকরী, যুগোপযোগী, স্বল্পব্যয়ী, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত। যার সঙ্গে রয়েছে লাইফস্টাইল প্রোগ্রাম বা জীবন-যাপন কর্মসূচি। তাই SAAOL করোনারি হৃদরোগ বা হার্টের ব্লকেজের একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পদ্ধতি।